বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রচলিত প্রবাদ বেশ অর্থবহ সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে একটু বেশিই ফুটে ওঠে। প্রবাদটি ছোট হলেও আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের একটি গভীর সত্যকে ধারণ করে। দেশের ছোট বড় প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই কম বেশি ভুলত্রুটি অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু সেই একই কাজ বা ভুল যখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেউ করে তখন জনমনে এবং গণমাধ্যমে আলোচনার পারদ স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। অন্য সব দলের অনিয়ম যেখানে রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে পার পেয়ে যায় সেখানে জামায়াতের বেলায় কেন আলাদাভাবে আঙুল তোলা হয়। উত্তরটা খুব সহজ তাদের দলের নামের শেষে থাকা ইসলামী শব্দ এবং তাদের রাজনীতিতে ধর্মের দোহাই দিয়ে জনগণের সহানুভূতি আদায়ের কৌশল। যেহেতু জামায়াত নিজেদের ইসলামী মূল্যবোধের ধারক বাহক হিসেবে উপস্থাপন করে তাই সাধারণ মানুষও অবচেতন মনে তাদের জন্য একটি অত্যন্ত উঁচু নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে রাখে। কিন্তু রাজনীতি যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তখন তাদের এই আদর্শের সাথে কৌশলের চরম সাংঘর্ষিকতা প্রকাশ পায়। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকে তাকালে এই দ্বিমুখী রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তারা দেশে শরিয়া আইন চান না বরং নিজেদের একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে পরিচয় দিতে চান। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও তারা প্রকাশ্যে দিনভর ভারতবিরোধী বক্তব্য দিলেও গোপনে তাদের সাথেই রুদ্ধদ্বার মিটিংয়ে বসে। এমনকি সম্প্রীতির বার্তা দিতে গিয়ে তাদের আরেক নেতা মণ্ডপে গিয়ে বলে বসেন যে রোজা আর পূজা একই জিনিস মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষা প্রশংসনীয় হলেও ইসলামী আকীদার দৃষ্টিতে রোজা ও পূজাকে এক করে দেখা স্পষ্টতই ধর্মের মূল চেতনার পরিপন্থী। এই ধরনের রাজনৈতিক সুবিধাবাদ প্রমাণ করে যে জামায়াত চায় না বা রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে শতভাগ ইসলামকে তাদের নীতিতে ধারণ করতে পারে না। তারা কৌশলের খাতিরে কখনো মধ্যপন্থী সাজে কখনো গোপন সমঝোতা করে আবার কখনো ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসেই হাত দেয়। ফলে একদিকে তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে একচেটিয়া সহানুভূতি পাচ্ছে অন্যদিকে তাদের নিজেদের ভুলের কারণে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ইসলাম ধর্মের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেহেতু প্রকৃত ইসলামের কাঠামোর সাথে তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অবস্থান এতটাই সাংঘর্ষিক তবে প্রশ্ন ওঠে দলের নামের শেষে ইসলাম শব্দটি ঝুলিয়ে রাখার যৌক্তিকতা কতটুকু। তারা যদি নিজেদের নাম থেকে ইসলাম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপি বা গণঅধিকার পরিষদের মতো একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তবে রাজনৈতিক মাঠের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাবে। এতে তারা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহারের অভিযোগ থেকে মুক্ত হবে এবং অনিয়ম করলে সেটাকে ধর্মের নামে প্রতারণা হিসেবে না দেখে কেবল সাধারণ রাজনৈতিক ভুল হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে। তারা আর ধর্মকে ঢাল বানিয়ে পার পাবে না আবার কেউ তাদের দিকে আলাদা করে ধর্মের অপব্যবহারকারী হিসেবে আঙুলও তুলতে পারবে না। অবশ্য এই পথ বেছে নিলে জামায়াতকে একটি বড় ত্যাগ বা স্যাক্রিফাইজ করতে হবে। ধর্মের কার্ড খেলে এতদিন যে সহজ সিমপ্যাথি ও একচেটিয়া ভোটব্যাংক তারা পেয়ে এসেছে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে একটি সুস্থ রাজনীতি ও ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে জামায়াতের এই স্যাক্রিফাইজ করা উচিত। নামের রাজনীতি বাদ দিয়ে সাধারণ দল হিসেবে মাঠে নামলে তারা যেমন অহেতুক বাড়তি সমালোচনার চাপ থেকে বাঁচবে তেমনই এদেশের সাধারণ মানুষও ধর্মের নামে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চর্চা থেকে মুক্তি পাবে।