কিছু দিন ইতিহাসে লেখা থাকে বিজয়ের জন্য, কিছু দিন লেখা থাকে বেদনার জন্য। আর ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জের জন্য এমনই এক কালো দিন, যে দিন রাজনীতির উত্তপ্ত সংঘাতের মাঝখানে ঝরে গেল পাঁচটি সাধারণ মানুষের প্রাণ। তাদের কেউ ছিলেন রিকশাচালক, কেউ পোশাক ব্যবসায়ী, কেউ দিনমজুর, কেউ দোকানের কর্মচারী, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। তারা কেউই আর সেদিন জীবিত অবস্থায় নিজের পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি।
সেদিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পূর্বঘোষিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই গোপালগঞ্জে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ভাঙচুর এবং দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলি ছোড়ে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে জেলাজুড়ে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনীসহ অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
প্রথমদিকে চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও, পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রমজান মুন্সীর মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচজনে।
যারা আর ফিরে আসেননি, তারা হলেন—
রমজান মুন্সী—গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার থানাপাড়া এলাকার আকবর মুন্সীর ছেলে। জীবিকার তাগিদে তিনি রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দীপ্ত সাহা—গোপালগঞ্জ শহরের উদয়ন রোডের বাসিন্দা সন্তোষ সাহার ছেলে। তিনি ছিলেন একজন তরুণ পোশাক ব্যবসায়ী। পরিবারকে ঘিরে ছিল তার অসংখ্য স্বপ্ন।
রমজান কাজী—কোটালীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা। তিনি টাইলস মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে দিনমজুরির কাজ করতেন। প্রতিদিনের আয়ে চলত তার সংসার।
ইমন তালুকদার—গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি একটি ক্রোকারিজ পণ্যের দোকানে চাকরি করতেন। পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তার।
সোহেল মোল্লা—টুঙ্গীপাড়ার বাসিন্দা। তিনি মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাভাবিক জীবনযাপনের সংগ্রামের মধ্যেই হঠাৎ থেমে যায় তার পথচলা।
নিহতদের স্বজনরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ছিলেন সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ, যারা জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হতেন। এই দাবিগুলো পরবর্তীতে একাধিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে জানায়, ঘটনায় পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
১৬ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিন শুধু পাঁচটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; পাঁচটি পরিবারের হাসি, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তার অনুভূতিকেও ভেঙে দিয়েছে। কোনো সন্তানের জন্য বাবা আর ফিরলেন না, কোনো মায়ের বুক খালি হয়ে গেল, কোনো স্ত্রীর অপেক্ষার অবসান হলো না, কোনো ভাই হারাল তার সবচেয়ে আপন মানুষটিকে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু কোনো মতপার্থক্যের মূল্য কখনোই মানুষের জীবন হতে পারে না। একজন রিকশাচালক, একজন দোকানকর্মী, একজন শ্রমিক কিংবা একজন ছোট ব্যবসায়ীর মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের পৃথিবী ভেঙে পড়ার নাম।
আজ, ১৬ জুলাইয়ের এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি রমজান মুন্সী, দীপ্ত সাহা, রমজান কাজী, ইমন তালুকদার এবং সোহেল মোল্লাকে।
তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।
ইতিহাসের প্রতিটি রক্তাক্ত দিন আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—সহিংসতা কখনো কোনো সমাধান নয়। যে প্রাণ একবার ঝরে যায়, তাকে আর কোনো তদন্ত, কোনো বিচার, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা কোনো বিতর্ক ফিরিয়ে আনতে পারে না। মানুষের জীবনই হোক সর্বোচ্চ মূল্য, আর এমন শোকের পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো না ঘটে—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।