দুই বন্ধুকে নিয়ে বাসার একটি কক্ষে ইয়াবা সেবন করছিল এক কিশোর। তা দেখতে পেয়ে প্রতিবেশী এক যুবককে ডেকে এনে বাঁধা দেয় ওই কিশোরের মা। এ ঘটনার সুত্রপাতে ক্ষুব্ধ হয়ে পরেরদিন মারামারির ঘটনায় একটি মামলায় বিপাকে পড়েছেন চারটি পরিবার। তাঁরা বলছেন- মাদক সেবনে বাঁধা দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলায় জড়ানো হয়েছে তাঁদের।
ঘটনাটি ঘটেছে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার জাকেরেরশূরা টিলারচর গ্রামে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলায় আসামী করা হয়েছে মাদক সেবনে বাঁধাদানকারী যুবক ওই এলাকার নিজাম প্রামাণিকের ছেলে আসিফ প্রামাণিককে (১৮)। এছাড়া আসামী করা হয়েছে- একই শেখ সৈয়দের ছেলে মেহেদী শেখ (২২), কালাম প্রামাণিকের ছেলে মোহাম্মদ প্রামাণিক (২২) ও আসলাম প্রামাণিকের ছেলে ফাহিম প্রামাণিক (২২)। এ মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অপর তিনজন পালিয়ে বেরাচ্ছেন। এছাড়া প্রতিপক্ষের হুমকি-ধমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যরা।
এ ঘটনায় আজ বুধবার (১৭ জুন) সরেজমিনে গিয়ে থানা পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়- একই এলাকার সৌদি প্রবাসী কবির মোল্যার ছেলে তামিম মোল্যা প্রায়ই বহিরাগতদের নিয়ে তাঁদের দোতলা বাড়ির একটি কক্ষে আড্ডা দেয় এবং মাদক সেবন করে। একইভাবে গত ১২ জুন বিকালে বসতঘরের একটি কক্ষে দুই বন্ধুকে নিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল তামিম মোল্যা (১৬)। বিষয়টি দেখতে পেয়ে তাঁর মা খোদেজা বেগম প্রতিবেশী যুবক আসিফকে ডেকে এনে ঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় ইয়াবা সেবন করা অবস্থায় হাতেনাতে ধরে লাঠি হাতে নিয়ে শাসন করে সে এবং তাঁদের কানধরে উঠবস করানো হয়। তা মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে রাখে ওই যুবক। ওই ভিডিওতে- ইয়াবা সেবনের বিষয়ে স্বীকারোক্তি রাখা হয় তাঁদের। পরে তাঁদেরকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং পাশ্ববর্তী এলাকায় বাড়িতে ফিরে যায় ওই দুই কিশোর।
পরেরদিন দুপুরে ওই দুই কিশোর ৫ থেকে ৬ টি মোটরসাইকেলে দলবল নিয়ে বাড়ি থেকে আসিফকে ডেকে নেয় এবং বাড়ির অদূরে স্লুইচগেট নামক জায়গায় নেয়া হয় তাকে। এ সময় ধারণকৃত ভিডিও ডিলেট করতে চাপ দেয় হয় এবং বাগবিতণ্ডা হয় তাঁদের মধ্যে। এক পর্যায়ে মারধর করা হয় আসিফকে। তা দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা ছুটে গিয়ে ওই গ্রুপকে মারধরসহ ধাওয়া দেন। এ ঘটনায় মাথা ফেটে আহত হয় পারভেজ ইসলাম (১৮) নামে এক যুবক। ঘটনার পরেরদিন চরভদ্রাসন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ওই যুবকের বাবা।
মামলায় তিনি উল্লেখ করেন- দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তাঁর ছেলেকে প্রতিপক্ষের লোক ভেবে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন- তাঁর ছেলে চরভদ্রাসন উপজেলা সদর থেকে মোটরসাইকেলে ফেরার পথে গতিরোধ করে এবং ভুলবুঝে প্রতিপক্ষের লোক ভেবে হামলা করে আসামীরা। পরে তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
এ ঘটনায় সরেজমিনে গেলে বন্ধুদের নিয়ে ছেলের মাদক সেবনে বাঁধা দেয়ার বিষয়ে স্বীকার করেন তাঁর মা খোদেজা বেগম। তিনি বলেন- ‘বাড়িতে রুম ভেতর থেকে দীর্ঘক্ষণ তালাবদ্ধ দেখে এবং গন্ধ পেয়ে আসিফকে ডেকে আনা হয়েছিল।’
আসিফের বাবা নিজাম প্রামাণিক বলেন- আমরা গরিব মানুষ। আমার ছেলে রংমিস্ত্রির কাজ করে খায়। মাদক বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় লোক ভাড়া করে এনে আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়। তখন এলাকার লোকজন তাঁদের ধাওয়া দেয় এবং একজনকে আটকে রেখেছিল। পরে আমরা থানায় জানাতে চাইলে উনাদের মুরব্বিরা এসে থানায় যেতে নিষেধ করে এবং মিমাংসা করে দেয়ার কথা বলছিল। কিন্তু মিমাংসা না করে উল্টা আমাদের নামেই মামলা দেয়া হয়েছে। আমরা আইনের কাছে সুষ্ঠ তদন্ত ও ন্যায্য বিচার চাই।
এদিকে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক কাজী রিপনের বরাত দিয়ে তিন কিশোরের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বাঁধা দেয়ার ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেন থানার ওসি মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন- ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স রয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার নেই কারও। একজনকে কুপানোর ঘটনায় মামলা নেয়া হয়েছে৷ আশা করি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’