একদিকে নিজের আট বছরের মেয়ের ওপর সংঘটিত ধর্ষণের বিচার পেতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এক অসহায় মা। অন্যদিকে সেই বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থাতেই তাকেই মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ, ভয়ভীতি এবং অর্থের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আসামিপক্ষের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ ভাড়া বাসা থেকে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি আপসনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন ওই মা।
গাজীপুরের শ্রীপুরে বিচারাধীন একটি শিশু ধর্ষণ মামলাকে কেন্দ্র করে এমন গুরুতর অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বাদী মোছা. সাহিদা আক্তারের অভিযোগ, নিজের আট বছরের মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনার বিচার পাওয়ার আশায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামিপক্ষের লোকজন বিভিন্নভাবে তাকে মামলা তুলে নেওয়া এবং আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।
তার দাবি, কখনো ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, আবার কখনো অর্থের বিনিময়ে মামলা আপস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে গত ৭ জুলাই ২০২৬ গাজীপুর মহানগরের বাসন থানা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি আপসনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে জানান সাহিদা আক্তার। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পাশাপাশি ওই দিনই গাজীপুর মহানগরের সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
যে মেয়ের জন্য মায়ের এই লড়াই
মামলার নথি ও বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা এলাকার বাদশা মিয়ার পাঁচতলা ভবনের একটি ইউনিটে আট বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে শফিকুল ইসলাম (৪০)-এর বিরুদ্ধে।
ঘটনার পর শিশুটির মা সাহিদা আক্তার বাদী হয়ে ১৫ জুলাই ২০২৪ইং তারিখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারায় শ্রীপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটি শ্রীপুর থানার মামলা নম্বর ২৬(৭)২৪ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
বর্তমানে মামলাটি গাজীপুরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
মায়ের ভাষায়, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার পাওয়াই তার একমাত্র প্রত্যাশা। কিন্তু সেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বদলে তাকে মামলাটি আপস করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
‘তুলে নিয়ে গিয়ে আপসনামায় স্বাক্ষর’
বাদী সাহিদা আক্তারের অভিযোগ, ৭ জুলাই২০২৬ইং তাকে তার ভাড়া বাসা থেকে কয়েকজন ব্যক্তি জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি আপসনামায় স্বাক্ষর করানো হয়।
এমনকি মামলাটি আপস করার জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজ উদ্দিনও তাকে আদালতে ডেকে নিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ তার।
বাদীর দাবি, সেখানে তাকে মামলার বিষয়ে আপস করতে বলা হয় এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে আপসনামায় স্বাক্ষর করানো হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আপসের চেষ্টা করার কথা স্বীকার আইনজীবীর
অভিযোগের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলাটি আপস-মীমাংসার চেষ্টা করার কথা স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আপস-মীমাংসা করতে কোনো সমস্যা নেই।”
তবে বাদীকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা জোরপূর্বক আপসনামায় স্বাক্ষর করানোর অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেয়নি।
প্রশ্ন উঠছে আপসের নেপথ্যে কী?
একটি শিশু ধর্ষণ মামলা আদালতে বিচারাধীন। এমন পরিস্থিতিতে মামলার বাদীকে যদি সত্যিই বাসা থেকে তুলে নিয়ে আপসনামায় স্বাক্ষর করানো হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
আরও প্রশ্ন উঠেছে—বাদীকে কারা তুলে নিয়েছিল? তাদের সঙ্গে আসামিপক্ষের কারও যোগাযোগ ছিল কি না? আপসনামাটি কোথায়, কী পরিস্থিতিতে এবং কার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর করা হয়েছে? বাদীকে অর্থের কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কি না? তাকে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব প্রয়োগ করা হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে বাদীর করা জিডি, কথিত আপসনামা, মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘বিচার চাই, আপস নয়’
শিশুটির মা সাহিদা আক্তারের অভিযোগের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক হলো—নিজের মেয়ের জন্য বিচার চাইতে গিয়ে এখন তাকেই নানামুখী চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
একজন মা হিসেবে মেয়ের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে তিনি আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তার অভিযোগ, সেই বিচারপ্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে এখন তাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
শিশু ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে বিচারাধীন মামলায় বাদীকে ভয়ভীতি, চাপ বা প্রলোভনের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা শুধু একজন মায়ের ওপর চাপ নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
পিপির বক্তব্য
এ বিষয়ে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবু তাহের নয়ন বলেন, শিশু ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় বাদীকে ভয়ভীতি দেখানো বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
তিনি বলেন, বাদী যদি জোরপূর্বক আপসনামায় স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ করেন, তাহলে ওই স্বাক্ষরের পেছনে কোনো চাপ, ভয়ভীতি কিংবা প্রলোভন ছিল কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন অপেক্ষা তদন্তের
মামলাটি বিচারাধীন। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।
তবে একজন মা যখন নিজের আট বছরের মেয়ের কথিত ধর্ষণের বিচার পাওয়ার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন তাকে তুলে নেওয়া, ভয় দেখানো কিংবা আপসনামায় স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং বিচারাধীন মামলাটি আপসের মাধ্যমে প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা হয়েছে কি না—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার জবাব বেরিয়ে আসাই এখন সবচেয়