স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দুই দশক আগে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক প্রকল্প এবং মৌলভীবাজারের ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়ের চুক্তি করা হয়েছিল। পরে সেই অর্থের একটি অংশ আদায় হলেও বাকি টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় বিরোধ, যার জের ধরে ২০০৭ সালে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, LGED-এর যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক প্রকল্পের আওতায় ২৬৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকার কাজ দুই ভাগে বাস্তবায়ন করা হয়। এর দ্বিতীয় অংশের টেন্ডার অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে মৌলভীবাজার জেলার ফেঞ্চুগঞ্জে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের টেন্ডারও আহ্বান করা হয়। দুটি প্রকল্পেরই প্রকল্প পরিচালক ছিলেন তৎকালীন LGED কর্মকর্তা আজিজুল করিম তারেক।
অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্প দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেডকে পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার একেএম শোয়েব বাশুরী ওরফে হাবলু, ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুল আলম এবং প্রকল্প পরিচালক আজিজুল করিম তারেক মোট ১৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা প্রদানের শর্তে একটি স্ট্যাম্প চুক্তি সম্পাদন করেন। ওই চুক্তির আওতায় কাজ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা আদায় করতে সক্ষম হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, বাকি ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা আদায় নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। মামলার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়, অবশিষ্ট অর্থ আদায়ের জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমনকি বিভিন্ন সময়ে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন আলোচিত অভিযোগ ও দুর্নীতির ঘটনা নতুন করে তদন্তের আওতায় আসে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ৯ এপ্রিল আব্দুল মোনেম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ মোট আটজনকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ দাবি এবং পরবর্তীতে সেই অর্থ আদায়ের জন্য প্রভাব ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে কাজ বরাদ্দ, প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা এবং চাঁদা দাবির অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।তবে দীর্ঘ ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মামলার পরিসমাপ্তি ঘটে ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর।মামলার অবসানের পর নতুন করে আলোচনায় আসে এর পটভূমি ও অভিযোগের উৎস।
সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে, মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার একেএম শোয়েব বাশুরী ওরফে হাবলুর সংশ্লিষ্টতার সূত্র ধরেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম এ মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের সিদ্ধান্ত এবং তদন্তে উঠে আসা তথ্যকে কেন্দ্র করে মামলাটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং বহুল আলোচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কারণে মামলাটি দীর্ঘদিন জনমনে আলোচনার বিষয় ছিল। যদিও মামলার নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বিচারিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে, তবুও এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা এখনও থামেনি।