ফরিদপুরের ভাঙ্গায় শিশু অপহরণ ও ধর্ষণ মামলার দীর্ঘ এগারো বছরের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে আদালত রায় ঘোষণা করেছেন । মামলার প্রধান আসামি ফরহাদ হোসেনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে দ্বিতীয় আসামি প্রশান্ত কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন বিচারক।
আজ (মঙ্গলবার, ৭ জুলাই) ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক শামীমা পারভীন আদালতকক্ষে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরপোড়াগাছা এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেনকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং তা অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বাসিন্দা দ্বিতীয় আসামি প্রশান্ত কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ভাঙ্গা থানাধীন মুনসুরাবাদ বাজার এলাকা থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীর ১২ বছরের মেয়েকে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অপহরণের সময় শিশুটির কাছে থাকা টিফিন ক্যারিয়ারে রাখা ব্যবসায়িক নগদ আড়াই লাখ টাকাও ছিনিয়ে নেয় মূল আসামি। পরবর্তীতে ফরহাদ হোসেন শিশুটিকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন ও ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর পিতা বাদী হয়ে ভাঙ্গা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ, মেডিকেল রিপোর্ট ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রধান আসামি ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় আসামি প্রশান্ত কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাকে খালাস দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) গোলাম রব্বানী বলেন, “আজ ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি ধর্ষণ ও অপহরণ মামলার রায় ঘোষিত হলো। রায়ে এই মামলার মূল আসামি ফরহাদকে ভিকটিমকে অপহরণ ও পরবর্তীতে ধর্ষণ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আসামি ফরহাদের বিরুদ্ধে আনিত ধর্ষণের অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম হওয়ায় ফরিদপুর জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এই রায় প্রদান করেন।”
“বিজ্ঞ আদালত আসামি ফরহাদকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারা এবং ৯(১) ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। একই সাথে তাকে ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা অনাদায়ে তাকে আরও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে এই মামলার অপর সহযোগী আসামি প্রশান্তর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত তাকে মামলা থেকে খালাসের আদেশ প্রদান করেছেন।”
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের সন্তোষ প্রকাশ করে আইনজীবী বলেন, “এই রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। আমরা মনে করি, এই ধরনের রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। যারা সমাজে এই ধরনের জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটন করছে, এই রায়ের পর তারা স্পষ্ট বুঝতে পারবে যে অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত ভালো এবং সুদূরপ্রসারী বার্তা বহন করবে।”