দুপুরের তপ্ত রোদ আছড়ে পড়ছে আড়িয়াল খাঁ নদের বুক চিরে জেগে ওঠা ধু-ধু বালুচরে। বাতাসে নদীর চরের চেনা সোঁদা গন্ধ, কিন্তু বাতাসে আজ কোনো স্বস্তি নেই। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে একদল মানুষের চোখ জলছল করছে, তাদের বুকভরা দীর্ঘশ্বাস যেন আড়িয়াল খাঁর পানির কলতানের চেয়েও ভারী। নদীর আগ্রাসী রূপ এই মানুষগুলোর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, ফসলি জমি, চেনা উঠোন। বছরের পর বছর সেই নদী যখন শান্ত হয়ে একটু একটু করে পলি জমিয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়া জমি ফিরিয়ে দিতে শুরু করল, ঠিক তখনই নতুন এক দুর্যোগ এসে হানা দিল। এবার দুর্যোগ কোনো প্রাকৃতিক ঝড় নয়, মানুষের তৈরি লোভের থাবা—অবৈধ ড্রেজার।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়নের আমির-খাঁ কান্দি গ্রামে এখন আর নদী ভাঙনের শুধু ভয় নেই, আছে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকু হারিয়ে যাওয়ার হাহাকার।

“আমরা নদী ভাঙা লোক, পাটনাদার হিসেবে (ভাড়া) পরের জাইগায় রইছি। আমাদের জায়গা জাগছে, মনে করছি অহনে বাড়ি করমু। সরকারের কাছে আমাগো দাবি- এই ড্রেজারডা যেন ওঠায় নেয়। নইলে আমাগো আরও ক্ষতি অইয়্যা যাইব, আমরা ঘরবাড়ি করতে পারমু না।”
দুঃখ ভরা মন আর ভাঙা গলায় কথাগুলো বলছিলেন ৫২ বছর বয়সী বিধবা নুরুন্নাহার বেগম। আড়িয়াল খাঁ নদের রাক্ষুসে ভাঙনে একদিন তার সাজানো সংসার তলিয়ে গিয়েছিল অতলে। বছরের পর বছর অন্যের জমিতে ভাড়া থেকে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছেন, বুক বেঁধেছেন আশায়—নদী যদি কোনোদিন শান্ত হয়, যদি চর জাগে, তবে আবার নিজের ভিটেয় ফিরে যাবেন। সেই চরে যখন নতুন করে ঘাস গজাচ্ছিল, তখনই সেখানে বসানো হয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলনের দানবীয় ড্রেজার মেশিন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সদরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক খাঁ ক্ষমতার দাপটে এই ড্রেজার বসিয়েছেন। ফলে চরের পলি শক্ত হওয়ার আগেই তা তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নুরুন্নাহারের মতো আমির-খাঁ কান্দি গ্রামের অর্ধশত নারী-পুরুষ নদের ভাঙনকবলিত পাড়ে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাদের দাবি একটাই—অবৈধ ড্রেজার হঠাও, ভিটেমাটি বাঁচাও।
চরমানাইর ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকাই পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদ বেষ্টিত। এখানকার প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার মানুষের জীবন কাটে নদীর সাথে লড়াই করে। যুগ যুগ ধরে চলা এই ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে হাজার একর জমি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফরহাদ হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, “আড়িয়াল খাঁ নদের কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে পাড়টি জেগে উঠেছে, মানুষ নতুন করে ঘরবাড়ি করার চিন্তা ভাবনা করছেন। কিন্তু বর্তমানে এই এলাকার প্রভাবশালী এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ড্রেজার বসানো হয়েছে। এই ড্রেজার দিয়ে বালু তুললে আর ঘরবাড়ি তোলা হবে না। তাছাড়া বসতি স্থাপন করা পাড়ও তীব্র ভাঙনের মুখে পড়বে।”
একই আশঙ্কার কথা জানালেন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মো. গোলাম মোস্তফা। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির এই ক্ষতি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন,”এমনেই নদী ভাঙতেছে, তার ওপর আবার ড্রেজার বসিয়ে কূমের (গভীর গর্তের) মতো সৃষ্টি হয়ে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যাবে। আমাদের জমিও আর জাগবে না। এলাকার লোকজন জমিজমা আর বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাবে। তাই আমরা চাই- অতিদ্রুত এই ড্রেজার সরিয়ে নেওয়া হোক।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক খাঁ। তার দাবি, সম্প্রতি ঝড়ে তার নিজস্ব জায়গায় অবস্থিত প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় ভেঙে গেছে। সেই নতুন ঘরের ভিটি ভরাট করার জন্যই সাময়িকভাবে এই বালু উত্তোলনের উদ্যোগ। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করেছেন বলেও জানান।
যদিও প্রশাসনের বক্তব্য রাজ্জাক খাঁর দাবির সাথে মিলছে না। সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নদী থেকে বালু তোলার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন,”ড্রেজারের বসানোর বিষয়ে মৌখিকভাবে জেনেছি। এর মধ্যে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে বাধা দিতে বলেছি। নিজ উদ্যোগে যদি ড্রেজার সরিয়ে না নেয় তাহলে, পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।”