ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটা, ওষুধের মজুত, অ্যাম্বুলেন্সের আয় এবং আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগে (সোমবার,১২ অক্টোবর) দুই দিনব্যাপী এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে প্রায় ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা ক্যাটল্যাব স্থাপন না করা এবং ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ক্যান্সার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দি পড়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া ওষুধের মজুতে ঘাটতি, চুক্তি অনুযায়ী সরঞ্জাম সরবরাহ না করা এবং অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়েও তথ্য পেয়েছে অভিযানকারী দল।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ফরিদপুরের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগী হয়রানি, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম এবং মেডিকেল ও সার্জিক্যাল সামগ্রী (এমএসআর) কেনাকাটায় দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ যাচাই করতে এ কার্যক্রম চালানো হয়।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ক্যাথল্যাব কেনা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো সেটি স্থাপন করেনি। অথচ কাজ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারকে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও চুক্তির শর্ত পালন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর মেশিন কেনার ক্ষেত্রেও। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মেশিনটি কেনা হয় এবং এর সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি না করেই যন্ত্রটি কেনায় এখনো তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের এই চিকিৎসা সরঞ্জাম।
অভিযানকালে হাসপাতালের এমএসআর স্টক রেজিস্টার পর্যালোচনা এবং সরেজমিনে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর মজুত যাচাই করে গরমিল পাওয়া গেছে। তদন্তে ‘ফেব্রিডেক্স’ নামের একটি ওষুধের প্রায় ৭৬২ বোতল ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ‘হেক্সিটল’ ওষুধের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি পাওয়া গেছে। এসব গরমিলের কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে, হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। রিএজেন্ট কেনার দরপত্রে এক্স-রে ও সিটি স্ক্যানের ফিল্ম সরবরাহের শর্ত থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা সরবরাহ করেনি বলে দুদকের অভিযানে তথ্য পাওয়া গেছে। চুক্তি অনুযায়ী সরঞ্জাম সরবরাহ না করা সত্ত্বেও সামান্য ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ’ বা ক্ষতিপূরণ কেটে ঠিকাদারকে বাকি বিল পরিশোধ এবং পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে অনিয়মের অভিযোগ হিসেবে খতিয়ে দেখছে দুদক।
হাসপাতালের পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দুটি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পাশাপাশি, অ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছ থেকে গত এক মাসে আদায় করা ইউজার ফি বা ভাড়ার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার তথ্য পেয়েছে অভিযানকারী দল।
এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক। এসব নিয়োগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে।
অভিযান শেষে দুদকের প্রতিনিধিরা জানান, সংগৃহীত নথিপত্র, রেজিস্টার ও অন্যান্য রেকর্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, কাজের শর্ত এবং সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে প্রধান কার্যালয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে। প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটা থেকে শুরু করে ওষুধের মজুত ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় উঠে আসা এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে অভিযানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এখনো কারও দায় চূড়ান্ত ভাবে নির্ধারিত হয়নি।