ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের সাময়িক বরখাস্তকৃত সাবেক অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদের বিরুদ্ধে কলেজের তহবিল আত্মসাৎ, সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বর্তমান শিক্ষক-কর্মচারীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আজ (বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই) কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. হোসনেয়ারা বেগম স্বাক্ষরিত এবং শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়।
এদিকে, সাবেক এই অধ্যক্ষের অপশাসন, দুর্নীতি ও হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে এবং কলেজের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতে কলেজের মূল ফটকের সামনে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে ছাত্রীরা ব্যানার হাতে নিয়ে সাবেক অধ্যক্ষের শাস্তির দাবি জানান।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ও স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ করা হয়, সাবেক অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদ বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং প্রভাব খাটিয়ে কলেজে একক আধিপত্য ও ভীতিরাজ্য বিস্তার করেন। তিনি নিয়ম-বহির্ভূতভাবে কলেজের সাধারণ তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অহেতুক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেছেন। এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ১০০ পাউন্ড ওজনের বিশাল কেক কাটা, জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিকে গাড়ি বহর নিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া এবং পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে যোগদানের নামে কলেজের বিপুল অর্থ অপচয় করার সুনির্দিষ্ট নজির উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আরো অভিযোগ করে বলেন, সাবেক এই অধ্যক্ষ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন শিক্ষককে ক্লাস না নিয়ে নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য করার অবৈধ সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তাঁর চরম আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কলেজের আর্থিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সাধারণ নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এই আর্থিক সংকটের কারণে চরম মানসিক ও অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় পড়ে রনজিৎ কুমার মন্ডল নামে কলেজের এক শিক্ষক স্ট্রোক করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
জানা গেছে, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। উক্ত সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, স্বৈরাচারী আচরণ ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি তাঁকে কলেজ প্রশাসন থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। বরখাস্ত হওয়ার পর আইনি জটিলতা ও জনরোষ এড়াতে তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে সাবেক অধ্যক্ষ ফরিদ আহমেদ হাইকোর্টে আপিল করেছেন, যার মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। একই সাথে ফরিদপুর জজ কোর্টেও এ সংক্রান্ত আরেকটি মামলা চলছে। যেহেতু সাবেক অধ্যক্ষ এখনো বহিষ্কৃত অবস্থায় আছেন এবং আদালত থেকে তাঁর পক্ষে কোনো সর্বশেষ স্থগিতাদেশ বা চূড়ান্ত রায় আসেনি, তাই আপাতত ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রবেশের কোনো আইনি সুযোগ নেই। বর্তমানে তিনি শাস্তির আওতায় রয়েছেন এবং তাঁর সরকারি বেতন-ভাতাসহ (এমপিও) সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বর্তমান কলেজ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সম্প্রতি আত্মগোপন থেকে ফিরে এসে সাবেক এই অধ্যক্ষ নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং বর্তমান শিক্ষক-কর্মচারীদের দমাতে ও কণ্ঠরোধ করতে একের পর এক সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করছেন। এর ফলে কলেজের নিরপরাধ শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে চরম ক্ষোভ, আতঙ্ক ও সম্মানহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে।
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রফিবুল হাসান গণমাধ্যমকে জনান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী কমিটি যেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিল, ঠিক একইভাবে নতুন কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে গভর্নিং বডি প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া সরকারি বা এমপিওভুক্ত সুবিধা ভোগ করে তিনি অন্য কোনো আর্থিক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছেন কি না, তাও সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ নীতিমালা দেখে খতিয়ে দেখা হবে।
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার স্বাভাবিক ও সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া সরাসরি শুনতে দ্রুতই কলেজ পরিদর্শনে যাবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। এ সময় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
ইউএনও জানান, “আমরা সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে সরাসরি কথা বলে, তাদের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করব। কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তি স্বার্থের কারণে কলেজের পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত করতে দেওয়া হবে না। অপরাধী যেই হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মানববন্ধনের শেষাংশে, কলেজের শিক্ষার সুষ্ঠু ও সুগম পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সাবেক অধ্যক্ষের এই নানামুখী হয়রানি ও মিথ্যা মামলা থেকে পরিত্রাণ পেতে সংবাদ মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেছে বর্তমান কলেজ প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের শিক্ষক সমাজ।