ফরিদপুর জেলা সদরের গেরদা ইউনিয়নের পূর্ব বাখুন্ডা গ্রামে এক বিএনপি কর্মীর ব্যক্তিগত সুবিধার্থে সরকারি রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এই স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদ করায় রওশানারা নাছরিন (৩৬) নামে এক অসহায় নারী ও তাঁর পরিবারকে অসামাজিক কর্মকান্ড এবং সুদের ব্যবসার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বসতঘরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে অভিযুক্ত ওই বিএনপি কর্মীর ভয়ে বাড়ি ও নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগী নারী।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব বাখুন্ডা গ্রামের মৃত আব্দুর রাজ্জাক মিয়ার মেয়ে রওশানারা নাছরিন পেশায় একজন বিউটিশিয়ান। বাখুন্ডা বাজারে তাঁর একটি বিউটি পার্লার রয়েছে। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী তাঁর একমাত্র ভাই ইমরান মিয়ার (৩০) পরিবারের সাথে বাবার বাড়ির অদূরে বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করতেন।
সম্প্রতি এডিবির (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) অর্থায়নে এলাকায় একটি ইটের রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তবে রাস্তাটি রওশানারার চাচাতো ভাই তথা স্থানীয় বিএনপি নেতা পরিচয়ধারী বিল্লাল চৌধুরীর (৪০) বাড়ির গেট পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। ফলে বিল্লালের পরিবার এককভাবে এই রাস্তার সুবিধা পেলেও প্রতিবেশী রওশানারার পরিবারটি চরম ভোগান্তিতে পড়ে। তাদের চলাচলের একমাত্র পথটি বৃষ্টিতে কাদামাটিতে রূপ নেয়।
এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করায় গত বৃহস্পতিবার বাখুন্ডা বাজারে রওশানারা নাছরিনকে বেধড়ক মারধর করেন বিল্লাল চৌধুরী ও তাঁর লোকজন। এ ঘটনায় রওশানারা কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বিল্লাল।
ভুক্তভোগী রওশানারা নাছরিন অভিযোগ করেন, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর বিল্লাল চৌধুরী তাঁর নিজস্ব বাহিনী নিয়ে এলাকায় তাঁর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মানববন্ধন করে। এরপর তাঁর বসতঘরের দরজায় দুটি তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এই অপকর্মে স্থানীয় ইউপি সদস্য জাকারিয়া হোসেনও জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।
রওশানারা বলেন,”২৬ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা শেষ করে পুরো পরিবারের হাল ধরেছি। আজ আমার চাচাতো ভাইয়ের অত্যাচারে আমি বাড়িছাড়া হয়ে শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছি। বিল্লাল কোনো চাকরি বা ব্যবসা না করেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। সে মূলত মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত এবং এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করছে। আমি প্রশাসন ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের কাছে এর বিচার চাই।”
আজ (বুধবার,০৮ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে পূর্ব বাখুন্ডা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রওশানারা নাছরিনের বসতঘরের দরজায় দুটি নতুন তালা ঝুলছে। পাশেই জরাজীর্ণ ঘরে তাঁর ভাই ইমরান মিয়া পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের ঘরের ঠিক সামনেই বিল্লাল চৌধুরীর দোতলা ভবন। ভবনের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত ঝকঝকে ইটের রাস্তা থাকলেও ইমরানদের চলাচলের জন্য রয়েছে কেবল একটি কাদামাটির সরু পথ, যা বৃষ্টির কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ইমরান মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সুবিধার্থে রাস্তা না করে শুধু বিল্লালের জন্য রাস্তা করা হয়েছে। বোন এর প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করে ঘরে তালা দেওয়া হয়েছে। আমাদেরও প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাস্তাটি মূলত বিল্লাল চৌধুরীর ব্যবহারের জন্যই করা হয়েছে, যার ফলে প্রতিবেশী পরিবারটির চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিল্লাল চৌধুরী মারধর বা ঘরে তালা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমার চাচাতো বোনের নামে এলাকায় খারাপ কাজের এবং সুদের ব্যবসার নালিশ রয়েছে। ভাই হিসেবে আমি তাকে শাসন করতেই পারি। এলাকার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর ঘরে তালা দিয়েছে। রাস্তা নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই।”
এ বিষয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সিরাজুল ইসলাম জানান, “বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”